পুঁজিবাজারে আর্থিকভাবে স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য বৃহৎ বিনিয়োগের কোম্পানিগুলো পরিচিত ‘ব্লু-চিপ কোম্পানি’ হিসেবে। ব্রিটিশ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শীর্ষ ১০০ ব্লু-চিপ কোম্পানিকে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এফটিএসই-১০০ সূচক। এসব কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদে ভালো করলেও এগুলোর বেতন কাঠামোর বৈষম্য নিয়ে আলোচনা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান হাই-পের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এসব কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীরা প্রতি বছর গড়ে বেতন নিচ্ছেন পূর্ণ কর্মদিবস নিযুক্ত সাধারণ কর্মীদের গড় মজুরির তুলনায় ১২২ গুণ বেশি।
বৃহৎ কোম্পানিগুলোর সিইওদের বেতন যেভাবে বাড়ছে সাধারণ কর্মীদের ক্ষেত্রে তা সেভাবে বাড়ছে না। শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে কর্মীদের বেতন-ভাতার ব্যবধান ক্রমেই বড় হচ্ছে। বিষয়টি এখন যুক্তরাজ্যে বড় এক রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপ নিয়েছে।
হাই পে সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এফটিএসই ১০০ কোম্পানিভুক্ত শীর্ষ নির্বাহীদের গড় মধ্যম বেতন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ড বা ৫২ লাখ ২০ হাজার ইউরো, যা প্রায় ৬২ লাখ ডলারের সমতুল্য। আগের বছর গড় বেতন ছিল ৪২ লাখ ৯০ হাজার পাউন্ড, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শীর্ষ নির্বাহীদের বেতন বেড়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৩ সাল থেকে ব্রিটিশ কোম্পানি নির্বাহীদের মূল বেতন, বোনাস, শেয়ার ও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে একসঙ্গে মোট আয় প্রকাশের ধারা শুরু হয়। তখন থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের গড় বেতনের পরিমাণ রেকর্ড সর্বোচ্চ।
এবার টেন মিলিয়ন ক্লাবে যুক্ত হওয়া করপোরেট বসের সংখ্যাও বেড়েছে। ১০ মিলিয়ন বা ১ কোটি পাউন্ড বেতন পাওয়া নির্বাহীদের এ ক্লাবের সদস্য বলে বিবেচনা করা হয়। গত বছর এফটিএসই ১০০ কোম্পানির ১৩টি তাদের সিইওদের বেতন-প্যাকেজ দিয়েছে ১০ মিলিয়ন পাউন্ড বা তার চেয়ে বেশি। অন্যদিকে ২০২৩-২৪ সালে এমন কোম্পানির সংখ্যা ছিল ১০। সামগ্রিকভাবে গত বছর যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো ২১৭ জন শীর্ষ নির্বাহীকে মোট ১০০ কোটি পাউন্ড বেতন দিয়েছে। আগের বছর তা ছিল ৭৫ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড।
ইউরো নিউজের প্রতিবেদন অনুসারে, কোম্পানির উচ্চ পর্যায়ে বেতনের এ উল্লম্ফন করপোরেট খাতে অতিরিক্ত ভোগবিলাস ও বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এমন এক সময় এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যখন অনেক ব্রিটিশ পরিবার উচ্চ জীবনযাত্রা ব্যয় ও স্থবির মজুরির সঙ্গে মানিয়ে নিতে লড়াই করছে।
কোম্পানির বোর্ড সদস্যদের মধ্যে সিইওদের বেতন সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড, যা ২০১৭-১৮ সালের সর্বোচ্চ রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব তথ্য প্রমাণ করছে যে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক নজরদারির মধ্যেও যুক্তরাজ্যের করপোরেট কোম্পানিগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের আয় ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
এবারের বেতনে বড় হিস্যা ছিল উৎপাদন ও শিল্প খাতের কোম্পানি মেলরোজ ইন্ডাস্ট্রিজের। যেখানে নির্বাহীরা সম্মিলিতভাবে পেয়েছেন ২১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড। এর মধ্যে শুধু মেলরোজের সাবেক ও বর্তমান দুই সিইও সাইমন পেকহ্যাম ও পিটার ডিলনট নিয়েছেন প্রায় ৫ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড। এরপর ১ কোটি ৮৯ লাখ পাউন্ড বেতন নিয়েছেন পিয়ারসনের সাবেক ও বর্তমান সিইও অ্যান্ডি বার্ড ও ওমর আব্বোশ। শীর্ষ ১০ বেতন দেয়া কোম্পানির তালিকায় এর পরে রয়েছেন পিয়ারসন, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, কোকা-কোলা ইউরোপ্যাসিফিক পার্টনারস, আরইএলএক্স, থ্রি আই, বিএই সিস্টেমস, এইচএসবিসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও এক্সপেরিয়ান।
শীর্ষ নির্বাহীদের বিপুল অর্থপ্রাপ্তির এ প্রবণতায় ভূমিকা রাখছে লং-টার্ম ইনসেনটিভ পেমেন্টস বা এলটিআইপি। মূলত বড় আকারের বোনাস স্কিম, যা নগদের বদলে কোম্পানির শেয়ার আকারে দেয়া হয়। শেয়ারদর, মুনাফা বা অন্যান্য পারফরম্যান্সের লক্ষ্য পূরণ এ স্কিমের সুবিধাভোগী হওয়ার প্রধান শর্ত; যেখানে সিইও ও শেয়ারহোল্ডাররা দুই পক্ষই লাভবান হবে। প্রায়ই নির্বাহীদের মোট বেতনে কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড যোগ করছে এলটিআইপি। গত বছর এফটিএসই ১০০ কোম্পানির ৮৫ শতাংশ সিইও এ আয় গ্রহণ করেছেন, যা আগের বছর ছিল ৮১ শতাংশ।
হাই পে সেন্টার বলছে, এক বা দুজন সিইওর পেছনে মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড খরচ ঠিক কিনা, তা ভাবা উচিত। যখন শীর্ষ নির্বাহীদের রেকর্ড বেতন দেয়ার একই প্রবণতা একাধিক কোম্পানিতে দেখা যায়, তখন এ বিষয়ে জনসাধারণ ও সরকার বা নিয়ন্ত্রকদের প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। শীর্ষ নির্বাহীদের উচ্চ বেতন কর্মী প্রশিক্ষণ, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এমন উদ্ভাবন কিংবা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মীদের উচ্চ মজুরিকে বাধাগ্রস্ত করছে কিনা ভেবে দেখতে হবে।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল তথ্য হলো, সিইওদের বেতন ও সাধারণ কর্মীদের মজুরির মধ্যে বিরাট ফারাক। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের পূর্ণকালীন একজন সাধারণ কর্মীর তুলনায় গড়ে ১২২ গুণ বেশি আয় করছেন এফটিএসই ১০০ কোম্পানির সিইও। গত কয়েক দশকে নির্বাহীদের বেতন বাড়তে বাড়তে আকাশছোঁয়া হলেও দেশটিতে গড় মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়েনি। ফলে অনেক পরিবার ভাড়া, বন্ধকি কিস্তি ও জ্বালানি বিলের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
হাই পে সেন্টার বলছে, যদি বেশিসংখ্যক চাকরি ট্রেড ইউনিয়নের সুরক্ষায় থাকে, সিইও ও কর্মীদের আয়ের এ বৈষম্য কমানো সম্ভব। বড় কোম্পানির বোর্ডে কর্মীদের নির্বাচিত পরিচালক রাখতে বাধ্য করা উচিত। এতে অন্তত একজন প্রতিনিধি পারিশ্রমিক নির্ধারণ কমিটিতে থাকবেন। হাই পে সেন্টারের পরিচালক লুক হিল্ডয়ার্ডের মতে, এ ধরনের অংশগ্রহণ সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।